অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের বিপক্ষে আইএমএফ

খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের বিরোধিতা করেছে আইএমএফ। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল; কিন্তু তা সফলতার মুখ দেখেনি। তাই এখানেও খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন ফলপ্রসূ হবে না। এর বিপরীতে আইএমএফের পক্ষ থেকে ব্যাংকিং খাতে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো ক্ষমতাশালী করে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়ার কথা বলেছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশ সফরকারি আইএমএফের ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর স্ট্যাবিলিটি রিভিউ (এফএসএসআর) কমিশন গতকাল মঙ্গলবার সকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এ মন্তব্য করে বলে জানা গেছে। আইএমএফের মিশন প্রধান মিজ সুসান জর্জ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন। মিশনটি গত রোববার ১২ দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছে।

প্রায় দেড় ঘণ্টা স্থায়ী এই বৈঠকে মূলত দেশের ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ, খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ নিয়ে আইএমএফের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়। একই সাথে বিভিন্ন সরকারি ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে কাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং তাদের কোন যোগ্যতায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন করেছে আইএমএফ।

এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার সুনির্দিষ্ট দু’টি পদক্ষেপ নিয়েছে। একটি হচ্ছে অনিচ্ছায় বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে যারা খেলাপি হয়েছেন তাদের ঋণ নিয়মিতকরণের জন্য একটি ‘এক্রিট প্ল্যান’ ঘোষণা।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে খেলাপি ঋণ অনেক কমে যাবে। একই সাথে সবচেয়ে খারাপ খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এ জন্য গত মার্চ মাসে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করে দেয়া হয়েছে। এ সময় আইএমএফের পক্ষ থেকে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে বলা হয়, এ ধরনের কোম্পানি গঠন করে উল্লেখ করার মতো খেলাপি ঋণ আদায় করা যায়নি। তাই বাংলাদেশে এই কোম্পানি গঠন বা নিয়োগ দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। জবাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তা বলেন, অন্য দেশে ব্যর্থ হলে যে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এখানে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হবে তা বলা যায় না। আগে এটি গঠন করা হোক, তারপর সফলতা-বিফলতা মূল্যায়ন করা হবে।

অন্য দিকে খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের এক্সিট প্ল্যান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন আইএমএফ প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ ভালো ঋণ গ্রহীতাদের খেলাপি হওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে। আর এতে খেলাপি ঋণ কতখানি কমবে তা অনিশ্চিত। সরকারের উচিত বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিয়ে খেলাপি ঋণ আদায় ত্বরান্বিত করা।

প্রসঙ্গত, গত জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এই সময়ে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৬২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। এর বাইরে খেলাপি হওয়া ঋণ রাইট অফ বা অবলোপন হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে দেশের ব্যাংক খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে এক লাখ ৬২ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। খেলাপির হার দাঁড়াবে ১৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

এ দিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের দৃষ্টান্ত পর্যালোচনা করে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াকে। এসব দেশ কিভাবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন করে খেলাপি ঋণ আদায়ে সমর্থ হচ্ছে তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। ফলে এসব দেশের আদলে গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির গঠন প্রক্রিয়া।

জানা গেছে, খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সাথে একটি চুক্তি করবে। চুক্তি অনুযায়ী, ব্যাংক যে খেলাপি ঋণগুলো আদায়ে ব্যর্থ হয় সেগুলো কোম্পানির অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দেবে। ট্রান্সফার করা খেলাপি ঋণগুলো আদায়ে ব্যবস্থা নেবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। কোম্পানিগুলো আদায়কৃত খেলাপি ঋণের ২০, ৩০ বা ৫০ শতাংশ অর্থ নিয়ে নিতে পারবে। সরকারি-বেসরকারি দুই ধরনের কোম্পানিই খেলাপি ঋণ আদায়ে কাজ করতে পারবে। তবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিটি অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবন্ধিত হতে হবে।

অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়ার জন্য একটি পৃথক আইন করার সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত কমিটি। আইনটির নাম দেয়া হয়েছে ‘সিকিউরিজেশন অব নন পারফরমিং লোন’। কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, কোম্পানি যদি মনে করে ঋণখেলাপিতে পরিণত হওয়া প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট পরিবর্তন করলে তা আবার সচল হবে এবং ঋণ পরিশোধ করতে পারবে তাহলে তা করতে পারবে। পাশাপাশি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পত্তি বিক্রির ক্ষমতা দেয়ার সুপারিশও এই আইনে করা হয়েছে। আইনের মাধ্যমে এসব ক্ষমতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে কমিটির প্রতিবেদনে। প্রস্তাবিত আইনটিতে ব্যাংকগুলোকেও বিশেষ ক্ষমতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ম্যাজিস্ট্রেটের সাহায্য নিয়ে ঋণখেলাপির প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়ে নিতে পারবে ব্যাংক।