দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকের জন্য বড় বরাদ্দ বাজেটে

প্রতি বছরের মতো আগামী বাজেটে ও রাষ্ট্রায়ত্ত দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকের জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে এই খাতে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই অর্থ রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংক দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে যে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে তা পূরণের জন্য দেয়া হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য চলতি অর্থবছরে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আগামী অর্থবছরে একই পরিমাণ বরাদ্দ রাখা হবে বলে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে টাকার অঙ্কের পরিমান মে মাসের প্রথমার্ধে চূড়ান্ত করা হবে।

এর আগে সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাব করার দিনে দেয়া বাজেট সংক্ষিপ্তসার বইতে ‘মূূলধন পুনর্গঠনে বিনিয়োগ’ শিরোনামে এই অর্থ বরাদ্দ দেয়া থাকত। এবং এটি সবার দৃষ্টিগোচর হতো খুব সহজেই। কিন্তু চলতি অর্থবছরের বাজেটে এই শিরোনামে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়নি। এ সংক্রান্ত কোনো শিরোনামেও বাজেট সংক্ষিপ্ত সারে উল্লেখ করা হয়নি।

এটি রাখা হয়েছে অন্য একটি শিরোনামে। যার নামকরণ করা হয়েছে ‘ইক্যুয়িটি রি-ইনভেস্টমেন্ট’ বা সম-মূলধন বিনিয়োগ। অনেকটা ‘লুকিয়ে-ছাপিয়ে’ অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব বাজেট বইতে এই তথ্যটি স্থান পেয়েছে বলে জানা গেছে। এই বইটি শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়েরই জন্য নির্দিষ্ট থাকে। এবারো এই বইতে ইক্যুয়িটি রি-ইনভেস্টমেন্ট শিরোনামে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব বাজেট বইতে এই অর্থ বরাদ্দটি স্থান পাবে।

এ বিষয়ে মন্তব্য করতে যেয়ে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতি বছর এই বিনিয়োগ করে আমরা কোনো রিটার্ন পাচ্ছি না। তাই এ ধরনের বরাদ্দটি শেয়ার হিসেবে বা সম-মূলধন হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া এটি যখন প্রতি বছরই করতে হচ্ছে, তাই একে আমরা রি-ইনভেস্টমেন্ট বলছি।

তবে অন্য একটি সূত্র জানায়, প্রতি বছর এই অর্থ বরাদ্দ দিয়ে ব্যাপক সমালোচনা মুখে পরে অর্থ মন্ত্রণালয়। তাই বিষয়টি যাতে তেমন কোনো প্রচার না পায় তার জন্য পুরো শিরোনামটি পরিবর্তন করে শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বইয়ে এই বিষয়টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ দিকে, প্রবল মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে সরকারি ব্যাংক। এই মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক সরকারের কাছে গেল ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে। মূলধন ঘাটতি পূরণের সবচেয়ে বেশি অর্থ চেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ঘাটতি পূরণের তার প্রয়োজন সাত হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর পরের অবস্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক। সরকারি ব্যাংকের মধ্যে খেলাপি ঋণের শীর্ষে থাকা এই ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি পূরণে প্রয়োজন ছয় হাজার কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের দরকার চার হাজার কোটি টাকা। এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক মূলধন ঘাটতি পূরণে চেয়েছে ৭৭৫ কোটি টাকা। অন্য দিকে, গ্রামীণ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সরকারি অংশ পূরণেও প্রয়োজন আরো এক কোটি ১২ লাখ টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত চার অর্থবছরে সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মেটানোর জন্য অর্থ দেয়া হয়েছে ১০ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যাংক বেসিককে। এই ব্যাংককে মোট দেয়া হয়েছে তিন হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। বরাদ্দের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সোনালী ব্যাংকে। তাকে দেয়া হয়েছে ৩০০৩ হাজার কোটি টাকা। একইভাবে জনতাকে ৮১৪ কোটি টাকা, অগ্রণীকে একহাজার ৮১ কোটি টাকা, রুপালীকে ৩১০ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককে ৭২৯ কোটি ৮৬ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে।

তবে এবার অস্বভাবিক মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে রাষ্ট্রীয় খাতে দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক জনতা। তাদের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছয় হাজার কোটি টাকা। উল্লেখ্য, শুধু এক বছরের ব্যবধানে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে গত বছর (২০১৮) ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১৭ হাজার ৩০৪ কোটি ৭৭ লাখ। ফলে বছরেই জনতার খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১১ হাজার ৪৮৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এই ঋণের পুরোটাই আবার দু’টি গ্রুপের কাছে রয়েছে। যাদেরকে দুর্নীতির ও অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই ঋণ প্রদান করেছে। ফলে ব্যাংকটি গত বছর নিট লোকসান করেছে তিন হাজার কোটি টাকা।