‘পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে আপ্রাণ চেষ্টায় সাঁতরে উঠি’

জুন ৩০ ২০২০, ০৪:৪৫

‘প্রতিদিনের মতো সোমবারও মনিং বার্ড লঞ্চে ঢাকায় যাচ্ছিলাম। ফরাশগঞ্জ এলাকায় পৌঁছালে ময়ূর-২ নামের একটি লঞ্চ আমাদের লঞ্চকে ধাক্কা দেয়। এ সময় লঞ্চটি কাত হয়ে যায়। দশ থেকে বারো জন যাত্রী আমার উপরে পড়েন। অনেকেই ডুবে যায়। আমিও পানিতে পড়ে যাই। পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে আপ্রাণ চেষ্টায় সাঁতরে উঠি।’

বুড়িগঙ্গায় মর্নিং বার্ড লঞ্চের দুর্ঘটনা থেকে ফিরে আসা জাহাঙ্গীর এভাবেই বর্ণনা করছিলেন তার বেঁচে যাওয়ার ঘটনা।

জাহাঙ্গীর জানান, তার বাড়ি মিরকাদিম পৌরসভার এনায়েত নগরে। সে রাজধানীর বঙ্গবাজারে কাপড়ের দোকানের কর্মচারী। ৮ বছর ধরে এই লঞ্চেই ঢাকা যাতায়াত করেন।

মনিং বার্ড লঞ্চের আরেক যাত্রী ফল বিক্রেতা মো. ওমর (৩৫)। তিনি বলেন, সকাল ৭টা ৫০মিনিটে মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে লঞ্চে উঠি। ঢাকায় যাচ্ছিলাম ফল কেনার জন্য। আমার সঙ্গে ছিলেন আরও তিনজন হকার। শ্যামবাজারের কাছে গেলে ময়ূরী লঞ্চের ধাক্কার আমাদের লঞ্চটি মুহূর্তেই ডুবে যায়। এ সময় পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আশেপাশ থেকে নৌকা ও ট্রলার যাত্রীদের বাঁচাতে এগিয়ে আসে। আমাকে উদ্ধার করতে চাইলে আমি পাশের এক মহিলা ও এক শিশুকে উদ্ধারের জন্য বলি। পিছন দিকে তাকিয়ে দেখি পানির নিচ থেকে টপ টপ করে মানুষের মাথা বেরিয়ে আসছে। কীভাবে কী হলো আমি নিজেই জানি না।

লঞ্চ ঢুবির ঘটনায় নিহতদের অনেকেই মুন্সীগঞ্জের রিকাবী বাজারের পশ্চিম পাড়া, গোয়াল গুন্নি, রামপাল, কাঠপট্টি, বজ্রযোগিনী, রামশিং ও আব্দুল্লাপুর এলাকার বাসিন্দা। সোমবার সরেজমিনে নিহতের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চলছে কান্নার রোল। স্তব্ধ হয়ে গেছে সদরের পশ্চিম রিকাবী বাজার এলাকা। আশপাশের মানুষ ও আত্মীয়-স্বজনদের ভিড় রয়েছে প্রতিটি বাড়িতেই।

এদিকে, মিরকাদিম পৌরসভার রিকাবী বাজারের পশ্চিম পাড়ার আব্দুল রহিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার ছেলে দিদার হোসেন (৪৫) ও মেয়ে রুমা বেগম (৪০) লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। তারা অসুস্থ বড় বোনের জামাতাকে দেখতে ঢাকায় যাচ্ছিলেন।

একই এলাকার পশ্চিম পাড়ার পরশ মিয়ার স্ত্রী সুফিয়া বেগম (৫৫) ও তার মেয়ে সুমা বেগম(২৫) যাচ্ছিলেন সদর ঘাটের সুমনা ক্লিনিকে ডাক্তার দেখাতে। স্ত্রী সুফিয়া বেগম মারা গেলেও বেঁচে যায় মেয়ে সুমা বেগম। তাদের বাড়িতেও চলছে এখন শোকের মাতম।

একই এলাকার শাহজাহান শরীফের পুত্র শিপলু শরীফ ঢাকায় যাচ্ছিলেন তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য হার্ডওয়ারের মাল আনতে। কিন্তু লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত হন তিনি। তার বাড়িতে এখন চলছে আহাজারি।

মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, নিহতদের পরিবারকে সরকারিভাবে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। লঞ্চে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী নেওয়া হলে এবং ফিটনেস ঠিক না থাকলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Share Button