প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের দৈনিক সোয়া ৭ ঘণ্টা অবস্থান নিশ্চিতের নির্দেশনা

ঢাকা বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষা কর্তৃপক্ষ বলেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা যাতে তাদের কাজের জন্য নির্ধারিত সময়ের পুরোটা কর্মস্থলে থাকেন সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক ইন্দু ভূষণ দেব সাক্ষরিত এক পরিপত্র বুধবার জারি করে এই নির্দেশ জানানো হয়েছে।

ইন্দু ভূষণ দেব বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, অনেক সময় থানা বা জেলা শিক্ষা-কর্মকর্তারা, বা ইনস্ট্রাক্টরা বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে অনেক শিক্ষককে তাদের কর্মস্থলে উপস্থিত পাননি। সেইসব শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নতুন এই নির্দেশনা বলে জানান তিনি।

“অনেক শিক্ষক দেখা যায় নির্ধারিত সময়ের পুরোটা না থেকে চার/পাঁচ ঘণ্টা থেকে চলে যান। আমাদের তো চার শিফটেরও ক্লাস চলে। কোনো একটা দুটা শিফট শেষ হলে অনেক শিক্ষক চলে যায়। এখন আমরা বলেছি যখন কোনো শিক্ষকের ক্লাস থাকবে না (পাঠদান থাকবে না) তখন ক্লাস না থাকলেও যেন তারা খাতা-পত্র দেখাশোনা করেন, বা লেসন পরিকল্পনা তৈরি করেন।”

তিনি বলেন, ঢাকা বিভাগের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় দুই হাজার/আড়াই হাজার, ফলে চারটা করে শিফট রয়েছে। সকাল সাতটা থেকে শিফট শুরু হয় আর বিকেল চারটা পর্যন্ত চার শিফটে ক্লাস চলে। আবার কোথাও কোথাও দুটি শিফট।

প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্লাস চলে ৯টা থেকে বারোটা পর্যন্ত। সোয়া বারোটা থেকে সোয়া চারটা পর্যন্ত থ্রি ফোর ফাইভ, জানান তিনি।

দেব জানান, “শিক্ষকদের ওয়ার্কিং আওয়ার (কর্ম-ঘণ্টা) সোয়া সাত ঘণ্টা করে। প্রায়ই শিক্ষকরা একটা শিফট শেষ হলে বাড়ি চলে যান। সে বিষয়টি এখন থেকে যাতে আর না ঘটে সেজন্যই এই নির্দেশনা।”

তিনি আরো জানান, ঢাকা বিভাগে যেখানে একাধিক শিফট আছে শুধু সেখানেই নয়, ঢাকার বাইরে যেখানে নটা থেকে সোয়া চারটা পর্যন্ত একটাই শিফট আছে সেখানেও একই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

দেব বলেন, ”মিসট্রেসরা বাসায় চলে যান। বলেন ঘরের কাজ-কর্ম থাকে। আবার ঢাকা এলাকার মধ্যে অনেকসময় শিক্ষকরা বলেন- গাড়ি পাই নাই, যানজট, কিংবা পারিবারিক বিষয় থাকে।…”

কিন্তু শিক্ষকদের এই অনুপস্থিতি ঠেকাতে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে কর্তৃপক্ষ, জানান মিস্টার দেব।

“এখন তদারকি অনেক বেশি। এই নির্দেশনার পরও নির্ধারিত সময়ে যদি তাদের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় তাহলে সরকারি শৃঙ্খলা বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হবে, বেতনও কাটা হতে পারে।”

বাংলাদেশে মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৯৩টি। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ১০ হাজার ৮০০র বেশি।

তিনি জানান, সব মিলিয়ে দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষক সংখ্যা প্রায় চার লাখ। এই শিক্ষকদের মধ্যে নারী শিক্ষক ৭০ শতাংশের ওপরে, জানান ঢাকা বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগীয় উপপরিচালক।

তবে এর আগেও সারা দেশেই এমন নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল।

কিশোরগঞ্জের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তানজিনা নাজনীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এর আগে একই নির্দেশনা সব স্কুলেই দেয়া হয়েছিল।

“এর পেছনে কারণ আছে। আমরা তো সদরে আছি। ভেতরের দিকে(প্রত্যন্ত এলাকা বোঝাতে) অনেকগুলো স্কুল আছে, যেগুলোতে ইন্সপেকশনে গিয়ে দেখা যায় অনেকে ফাঁকিবাজি করেন। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের পরে স্কুল খোলেন আবার তিনটা সাড়ে তিনটার দিকে স্কুল বন্ধ করে দেন। থানা শিক্ষা অফিসাররা গিয়ে শিক্ষকদের পান না।

তিনি বলেন, অভিযোগ আছে অনেকে বাসায় চলে যান, কেউ কেউ দেখা যায় ক্লাসে না পড়িয়ে কোচিং সেন্টারের সাথে জড়িয়ে যান।

পরিস্থিতি কতটা প্রকট?
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে ক্যাম্পে নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এর প্রধান রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এই সমস্যাটা একসময় খুবই প্রকট ছিল। নব্বই এর দশকে খুবই শোচনীয় ছিল।

তিনি বলছেন শিক্ষকদের নির্ধারিত ঘণ্টা ধরে কাজ না করার বিষয়টি নিয়ে এখনও যে বড়ধরনের সমস্যা রয়ে গেছে, আর এটা যে প্রকট হয়ে উঠেছে তা এই পরিপত্র জারি করা থেকেই বোঝা যায়।

”এটা একদিকে যেমন তাদের (শিক্ষকদের) নীতি-নৈতিকতার বিষয়, অন্যদিকে তেমনি শৃঙ্খলার ব্যাপার। অনেকসময় শৃঙ্খলা বিধি তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় না, অনেক ক্ষেত্রে তারা এগুলোর তোয়াক্কা করেন না। ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা।”

তিনি বলেন, এটা শিক্ষকদের দায়িত্বের অংশ যে পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও তাদের সৃজনশীলতাকে উদ্বুদ্ধ করা, খেলাধুলার দিকে শিক্ষার্থীদের মনোযোগী করা।

তবে রাশেদা কে চৌধুরী এ-ও বলেন যে, শুধু ঢালাওভাবে শিক্ষকদের দোষারোপ না করে আরো যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে তা হলো, অনেক সময় শিক্ষকদের বাড়তি অনেক কাজ করতে হয়।

”স্কুলের কাজের প্রয়োজনেই তাদের উপজেলা প্রশাসন বা শিক্ষা প্রশাসনের সাথে অনেক দেন-দরবারও করতে হয়, বিশেষ করে প্রধান শিক্ষকদের। অনেক সময় সরকারি নানারকম কাজ-কর্মে থাকতে হয়। নির্বাচনকালীন সময়েও দায়িত্ব পালন তো আছেই।”

তিনি মনে করেন, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষকতার ক্ষেত্রে মেয়েরা সংখ্যায় বেশি হওয়ায় অনেক সময় বলা হয়, তারা মাতৃত্ব-কালীন ছুটি বা গৃহস্থালীর কাজকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার কাজে সময় কম দেন। কিন্তু এ নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। সুতরাং ঢালাওভাবে তা বলা যাবে না। আর নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রেই এ পরিপত্র প্রযোজ্য, বলেন রাশেদা কে চৌধুরী।

কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে?
এই শিক্ষা গবেষক বলেন “এটা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার বিষয়। তবে এটাও মনিটরিং-এর আওতার মধ্যে থাকতে হবে। নাহলে এটা ব্যর্থ হবে। যেমন ধরেন এই পরিপত্র থাকা সত্ত্বেও দেখা গেল অনেক স্কুলে এমনটা ঘটছে। সেখানে রাজনৈতিক অর্থ-বিত্তের প্রভাব খাটিয়ে কেউ যদি পার পেয়ে যায়?”

তবে তিনি মনে করেন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এই অনুপস্থিতি রোধ করা সম্ভব হবে।

“সদিচ্ছা থাকলে এটা করা যাবে, যার প্রমাণ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর ক্ষেত্রে এবার আমরা পেয়েছি।”
সূত্র : বিবিসি