শিশুদের কী বানাবেন

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ পৃথিবীতে মানুষের আবাদ করছেন এবং করবেন। একমাত্র আদম আ: ও বিবি হাওয়া ছাড়া এ পৃথিবীতে সবারই শিশুকাল থাকে। সবারই একটি বাল্যকাল আছে। প্রত্যেক শিশুই যে পরিবেশে, যাদের সংস্পর্শে এবং যাদের মাধ্যমে প্রতিপালিত হয়, সেই পরিবেশেরই ধারক-বাহক রূপ একটি মজবুত খুঁটি হয়ে দাঁড়ায়।

‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।’ এ শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ বাবা-মা, রাষ্ট্রসহ দেশ এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের কর্ণধার। অতএব, আগামী প্রজন্মকে সত্যিকার মানুষ রূপে গড়ে তোলার জন্য এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী শান্তিকামী কল্যাণকামী সমাজ গড়ে ওঠার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য নিজ নিজ সন্তানকে গড়ে তুলি। প্রত্যেকটি পরিবার একেকটি পরিকল্পনার প্রথম অঙ্কন, প্রথম রেখা। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নিরলস প্রচেষ্টা চলে জান-মাল-সময় ক্ষেপণের মাধ্যমে।

সব দম্পতি চেষ্টা করেন তার সক্ষমতার প্রান্ত পর্যন্ত। কিন্তু সবাই কি সফলতার মুখ দেখেন? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের সবার জানা।

এখন আমরা একটু সন্তানদের গড়ে ওঠার কথা ভাবি। আদেশ-উপদেশ সংবলিত কুরআনের বাণীর সাহায্য নেই। সাহায্য নেই সেই মহান মানব আমাদের শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর সুন্নাহ- যিনি আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ থেকে সমগ্র মানুষকে সোনার মানুষে, শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং অনুকরণীয় মানুষে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাই সন্তান প্রতিপালনে সুফল লাভে ইসলামের বিকল্প নেই।

সন্তানদের কী বানাব- এ ভাবনা আমাদের বিয়ের আগেই ভাবতে হবে। কেননা, যাকে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করব, তিনি ইসলামের অনুশাসন মানেন কি না তা জেনে বিয়ে করা জরুরি। তাহলে যেভাবে মানুষ করতে চাই, সেভাবে সন্তান প্রতিপালন করতে বাধার সম্মুখীন হতে হবে না। স্বামী-স্ত্রী দু’জন একই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে সন্তান প্রতিপালন করা যাবে। গাছ লাগানোর সময় প্রয়োজনীয় গাছের বীজই লাগিয়ে থাকি। চাই আম গাছ অথচ জাম গাছের বীজ রোপণ করি।

সন্তান আমাদের কাছে আল্লাহর আমানত। এ আমানতের হিসাব আল্লাহ পাক নেবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
‘তোমাদের অধীনস্তদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে।’

পুরুষ-মহিলা উভয়েই পরিবারের পরিচালক। উভয়েই ঘরে-বাইরে সন্তান প্রতিপালনে বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করবেন। যখন সন্তানদের বাইরে নিয়ে যাবেন, লক্ষ করুন সে কী দেখতে পছন্দ করে। নিয়ে যান খেলনার দোকানে। দেখুন সে কী স্পর্শ করে। আপনার বন্ধু-আত্মীয়দের মধ্যে যারা যে পেশায় নিয়োজিত আছে, তাদের কাকে সে পছন্দ করে। শিশু যা পছন্দ করে সে দিকে তাকে আগ্রহী করার জন্য আরো উপকরণ দিন। সন্তান যাকে পছন্দ করে তার ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরুন।

শিশুর যতটুকু যোগ্যতা আছে, তাকে শাণিত করার জন্য আপনার বুদ্ধিমত্তা যোগ করুন। শিশু যদি ঘরবাড়ি পছন্দ করে তবে তাকে আর্কিট্যাক্ট বানান। কাজে গতিবিধি দেখুন। সে কোন মানুষকে মডেল মনে করে। কোন কাজের প্রতি তার আগ্রহ বেশি।

নারী-পুরুষ উভয়ই সমাজ বিনির্মাণে অংশগ্রহণ করে। পুরুষের পাশাপাশি নারী-শিশুর প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা:-এর যুগের মেয়েদের বিভিন্ন অবদানের এবং কাজের কথা সর্বজনবিদিত। খাদিজা রা: ব্যবসায়ী ছিলেন। আয়েশা রা: উঁচু দরের কবি ছিলেন। বংশধর বিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। এ বিষয়ে তিনি শিক্ষা দিতেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে ৮৮ জন মোহাদ্দেস ছিলেন, যারা পরবর্তীকালে ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রভূত অবদান রেখে গেছেন। তিনি সহিহ হাদিস বর্ণনায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং পুরুষ-মহিলার মধ্যে তৃতীয় স্থানের অধিকারী ছিলেন।

সুস্থ-সুন্দর, ধৈর্যশীল বিনয়ী পরোপকারী সন্তান বিনির্মাণে মা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন। শিক্ষিত মা যদি নিজের ক্যারিয়ার এবং সম্পদ বাড়ানোর আকাক্সক্ষায় বাইরে কাজ করেন আর সন্তান মানুষ হয় অশিক্ষিত কাজের মেয়ের কাছে। দেখা গেছে, তার মানসিক বিকাশ তেমন মায়ের মতো হয় না। গাড়ি-বাড়ি বৃদ্ধি অথবা ঐশ্বর্যের আকাক্সক্ষা কমিয়ে স্বামীর আয়ের ওপর সন্তুষ্ট থেকে সন্তান প্রতিপালনের ভার আপনিই গ্রহণ করুন। দেখবেন সন্তান আপনার মতো শিক্ষিত দরদি মার্জিত হবে। পাবে আপনার মতো উদার মানসিকতা। আপনি তাকে যা বানানোর ইচ্ছা করেন, তা বানানোর জন্য প্রভাব ফেলতে পারেন। দেখবেন, একটু একটু করে আপনার লক্ষ্যের দিকে তাকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন। এখানেই আপনার সফলতা এবং স্বার্থকতা।

সব কাজেরই গুরুত্ব রয়েছে। মহিলা ডাক্তার যদি না বানাই তবে মেয়ে ডাক্তার কোথায় পাবো? মেয়েকে যদি শিক্ষিত না করি তবে মেয়ে শিক্ষক কোথায় পাবো? সব পেশার গুরুত্ব রয়েছে। দাউদ আ: লোহার কাজ করতেন। ছোট-বড় সব কাজই একটি সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে ছেলেমেয়ে সবারই কাজ করা দরকার। তবে যাই হই, একজন ভালো মুসলমান হতে হবে। আল্লাহভীতি একজন মানুষকে সৎ, সুন্দর, পরোপকারী হতে সাহায্য করে। সন্তানদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত হবে। মাটির পৃথিবী পাবে বেহেশতি পরিবেশ।

লেখক : কথাশিল্পী