শ্বাসরুদ্ধকর জয়ে ফাইনালে নিউজিল্যান্ড

খেলা শেষ। ভারতের সব খেলোয়াড় একখানে জড়ো হচ্ছেন মাঠ ছাড়বেন বলে। তার আগে হাত মেলাচ্ছেন নিউজিল্যান্ডের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের সঙ্গে।

কিন্তু একে একে সবাই সামনে চলে এলেও দেখা নেই বিরাট কোহলির। স্ট্যান্ডের ক্যামেরা তাকে খুঁজে নিলো সারির পিছন থেকে। প্রতিদিন খেলা শেষে যে সামনে থাকে সে আজ পিছনে। গ্যালারি থেকে নেমে মাঠের এক কোণে হতাশ হয়ে ঠায় দাঁড়ায় ভারতের ক্রিকেটাররা।  মাথা নিচু। এক সতীর্থ অন্য সতীর্থের মধ্যেও নেই কোনো আলাপন।

অনেকেই হাত দিয়ে চোখ-মুখতে চাইলেন বারবার; কিন্তু সেই মুছায় কি আর হতাশার চাপ মোছা যায়? চোখে-মুখে কেমন যেন অবিশ্বাস- ঠিক যেন বিশ্বাস হচ্ছে না হেরে গেছেন। বহু লালিত স্বপ্নের বিশ্বকাপ এখানেই শেষ!

ভারতের যেখানে শেষ, সেখানেই যেন শুরু নিউজিল্যান্ডের। আনন্দে মেতে ওঠে উইলিয়ামসন বাহিনী। অবশেষে বিশ্বকাপের ফাইনাল। নিউজিল্যান্ড এখন বিশ্বকাপের  ফাইনালে।

ভারতকে ১৮ রানে হারিয়ে বহু আরাধ্যের দ্বিতীয় ফাইনালে তারা। আর মধুর এই ক্ষণটাও কিনা এলো গ্যালারিভরা ২৬ হাজার দর্শকের সামনে, ইংলিশদের দেশে।

বিশ্বকাপে অপরাজেয় দলটিকে থমিয়েছে কেন উইলিয়ামসনের দল । কিন্তু নিজেদের খেলাটা কি ভারত খেলতে পেরেছে? ব্যাটিং লাইন আপের শ্রেষ্ঠত্বে যাদের বিশ্বজোড়া খ্যাতি, সেই ব্যাটিং-ই যে ম্যাচটাকে হাত থেকে ফসকে দিল।

বল হাতে ভারতীয় ব্যাটিং লাইন আপ ধসিয়ে দিয়ে বল হাতে ম্যাচের ত্রাতা হয়ে গেলেন কিউই পেসার ম্যাট হেনরি।

বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের দেয়া ২৪০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বিপদে পড়ে ভারত। দলীয় ৫ রানের মধ্যে ফিরে যান দলের কিন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি ও লোকেশ রাহুল। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই ম্যাট হেনরির দুর্দান্ত ডেলিভারতি টম লাথামের হাতে তালুবন্দী হয়ে ফেরেন রোহিত শার্মা।

তৃতীয় ওভারে ট্রেন্ট বোল্টের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে কোহলি যখন ফিরে যান দলের রান তখন ৫। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি ভারতীয় অধিনায়ক।

চতুর্থ ওভারের প্রথম বলে পেসার হেনির দ্বিতীয় আঘাত হানেন। এবার তার শিকার ওপেনার লোকেশ রাহুল। উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়েছেন তিনি। ভারতের রান তখনও ৫।

রোহিত, কোহলি, রাহুল প্রত্যেকের ব্যাট থেকে আসে ‘এক’ রান করে।

তিন টপ অর্ডার হারিয়ে চাপে পড়া ভারতকে ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন ঋষভ পান্ত ও দিনেশ কার্তিক। ডিফেন্সিভ খেলতে থাকা কার্তিক দলীয় ২৪ রানে হেনরির তৃতীয় শিকার হলে ভারত পড়ে যায় কঠিন চাপে। ২৫ বলে ৬ রান করে নিশামের দুর্দান্ত ক্যাচে ফেরেন তিনি।

পঞ্চম উইকেটে পান্ত ও হার্দিক পান্ডিয়া দেখে-শুনে খেলার চেষ্টা করলেও মিচেল স্যান্টনারের দ্বিতীয় ওভারের পঞ্ম বলে ওভার বাউন্ডারি হাঁকাতে গিয়ে সীমানার কাছে গ্রান্ডহামের তালুবন্দিতে ফেরেন পান্ত। ৫৬ বলে ৩২ রান আসে তার উইলো থেকে।

৭১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে অনেকটাই খেলা থেকে ছিটকে পড়ে ভারত।

৯২ রানের মাথায় পান্ডিয়ার উইকেটটি খোয়ালে, মনে হচ্ছিলো ভারত হারের খাদে পড়ে গেছে। কিন্তু ভারত বলে কথা। তখনও যে মাঠে ছিলেন বিশ্ব সেরা ‘ফিনিশার’ মহেন্দ্র সিং ধোনি।

দেখে-শুনে খেলে রবীন্দ্র জাদেজাকে নিয়ে খেলা জমিয়ে তুলেন। ৫৬ বলে জুটিতে পূর্ণ করেন ৫০ রানের পার্টনারশিপ। জাদেজা ছড়ি ঘুরাতে থাকেন একটু বেশিই। হেসে-খেলে মাত্র ৩৯ বলে ক্যারিয়ারের ১১তম অর্ধশতক তুলে নেন তিনি।

ভারতকে খেলায় ফেরানো জাদেজা ২০৮ রানের মাথায় বোল্টের বলে উইলিয়ামসনের ক্যাচে আউট হলে তখন ভারতের প্রয়োজন লাগে ১৩ বলে ৩২ রান। ৫৯ বলে ৪ বাউন্ডারি ও চার ছক্কায় ৭৭ রান করেন জাদেজা।

সপ্তম উইকেটে ধোনি-জাদেজার জুটিতে আসে ১১৬ রান।

জয় থেকে যখন দল ২৪ রান দূরে এমন মুহূর্তে ধোনি রান আউট হলে, ভারতের কপাল থখনই পুড়ে যায়। সেরা ফিনিশারও আর পারেননি ভারতকে রক্ষা করতে।

মর্টিন গপটিলের দারুণ থ্রোতে রান আউট হওয়ার আগে ৭২ বলে এক ছক্কা ও এক চারে ৫০ রান করে শেষ বিশ্বকাপ খেলে সাজঘরে ফেরেন ধোনি।

শেষ দুই উইকেট ভুবেনশ্বর কুমার শূন্য ও যুজবেন্দ্র চাহাল ৫ রান করে আউট হলে ৪৯.৩ ওভার ২২১ রানে থেমে যায় ভারতের ইনিংস।

বিশ্ব সেরা ব্যাটিং লাইন আপ তকমা যাদের গায়ে, তাদের কাছে এমন লড়াই হয়তো অপ্রত্যাশিত। মূল ধারার কোনো ব্যাটসম্যানই লড়তে পারেননি। শেষ দিকে মহেন্দ্র সিং ধোনি ও রবীন্দ্র জাদেজা ছাড়া। তবে এই হারে ভারতের টপ অর্ডার ব্যটসম্যানদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

নিউজিল্যান্ড বোলারদের মধ্যে ম্যাট হেনরি ৩টি, মিচেল স্যান্টনার ও ট্রেন্ট বোল্ট ২টি ও লকি ফার্গুসন একটি উইকেট শিকার করেন।

মঙ্গলবার যেখানে থেমেছিল ম্যাচ সেখান থেকেই আবার শুরু হলো আজ। নিউজিল্যান্ডের ইনিংসে ৩ ওভার ৫ বল বাকি থাকতে আগের দিন থেমেছিল খেলা। তাদের সংগ্রহ ছিলো ৫ ‍উইকেটে ২১১ রান।

বুধবার খেলা শুরুর পর অবশিষ্ট ২৩ বলে ২ উইকেট হারিয়ে ২৮ রান তুলেছে কেন উইলিয়ামসনের দল। ফলে তাদের সংগ্রহ দাড়িয়েছে ৮ উইকেটে ২৩৯ রান। ভারতকে জয়ের জন্য করতে হবে ২৪০। হাতে ৫ উইকেট থাকার পরও বেশি রান তুলতে না পারার জন্য ভারতের ভালো ফিল্ডিং ও নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা দায়ী।

আগের দিন অপরাজিত থাকা রস টেইলর এদিন রবীন্দ্র জাদেজার সরাসরি থ্রোতে রান আউট হয়েছেন ৪৮তম ওভারের শেষ বলে । ৯০ বলে ৭৪ রানে থেমেছে তার ইনিংস। পরের ওভারের প্রথম বলে বাউন্ডারি দুর্দান্ত এক ক্যাচে টম লাথামকে ফিরিয়েছেন আবারো সেই রবীন্দ্র জাদেজা। বোলার ছিলেন ভূবনেশ্বর কুমার। একই ওভারের শেষ বলে নিকোলাস হেনিরকেও তুলে নিয়েছেন ভুবি। সব মিলে তিনি ৪৩ রানে নিয়েছেন ৩ উইকেট। ফলে নিউজিল্যান্ড স্লগ ওভারে যে গতিতে রান তোলার আশা করেছিল তা পারেনি।

এর আগে প্রথম দিন..

মঙ্গলবার ২০১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রথম সেমিফাইনালে ম্যানচেস্টার ওল্ড ট্রাফোর্ডে টস জিতে ভারতের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় নিউজিল্যান্ড। টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই হোচট খায় কিউইরা। ওপেনিং ব্যাট করতে আসেন মার্টিন গাপটিল ও হেনরি নিকোলস।

দলীয় প্রথম রানের দেখা পায় ১৭ বলের মাথায়। আর ৩.৩ ওভারের মাথায় ১৭ বলে ১ রান করে সাজ ঘরে ফেরেন গাপটিল। দলপতি ক্যান উইলিয়ামসন নিকোলসকে নিয়ে প্রাথমিক চাপ সামলে খেলার চেষ্টা করেন। এর ফলে উইকেট বাঁচাতে গিয়ে রানের দিকে নজরই দিতে পারেননি কিউইরা।

রক্ষণাত্মক খেলতে থাকা নিউজিল্যান্ড প্রাথমিক চাপ কাটিয়ে রানে ফিরতে চাইলেও ১৮.২ ওভারে হেনরি নিকোলাস ৫১ বল খেলে ২৮ রানে আউট হলে ভয়টা আরও চেপে বসে নিউজিল্যান্ডের উপর। ৩৫.২ ওভারে উইলিয়ামসন ৯৫ বলে খেলে ৬৭ রানের মাথায় চাহালের বলে জাদজার হাতে ক্যাচ দিযে সাজ ঘরে ফেরেন।

এরপর জেমস নিশামের ১৮ বলে ১২ ও কলিন ডি গ্রান্ডহোম ১৬ বলে ১০ রান করে আউট হলে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে কিউইরা। ৪৫ ওভারে দলীয় ২০০ রানের মাথায় কলিন ডি গ্রান্ডহোম আউট হলে ব্যাটিংয়ে নামেন উইকেটকিপার কাম ব্যাটসম্যান টম লাথাম।

রস টেইলর একপ্রান্ত আগলে রেখে খেলতে থাকেন। ৪৬.১ ওভার পর বৃষ্টিতে ম্যাচটি বন্ধ হয়ে যায়। ৬৭ রান করে অপরাজিত আছেন টেইলর। ৩ রানে অপরাজিত আছেন টম ল্যাথাম।

ভারতের হার্দিক পান্ডিয়া ১০ ওভারে ৫৫ রান দিয়ে একটি, রবীন্দ্র জাদেজা ১০ ওভারে ৩৪ রান দিয়ে একটি আর যুভেন্দ্র চাহাল ১০ ওভারে ৬৩ রান দিয়ে একটি উইকেট তুলে নেন। ভুবনেশ্বর কুমার ৮.১ ওভারে ৩০ রান দিয়ে একটি উইকেট পান। আর জাসপ্রিত বুমরাহ ৮ ওভারে ২৫ রান দিয়ে তুলে নেন একটি উইকেট।

ম্যান অব দ্য ম্যাচ : ১০ ওভারে এক মেডেনসহ ৩৭ রান দিয়ে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ৩ ্উইকেট শিকার করে ম্যাচ সেরা হন কিউই পেসার ম্যাট হেনরি।

ভারতীয় একাদশ : রোহিত শর্মা, লোকেশ রাহুল, বিরাট কোহলি (অধিনায়ক), রিশাভ পান্থ, এমএস ধোনি (উইকেটরক্ষক), হার্দিক পান্ডিয়া, দিনেশ কার্তিক, রবীন্দ্র জাদেজা, ভুবনেশ্বর কুমার, ইয়ুজবেন্দ্র চাহাল, জসপ্রিত বুমরাহ।

নিউজিল্যান্ড একাদশ : মার্টিন গাপটিল, হেনরি নিকোলস, কেন উইলিয়ামসন (অধিনায়ক), রস টেলর, টম লাথাম (উইকেটরক্ষক), জেমস নিশাম, কলিন ডি গ্রান্ডহোম, মিচেল স্যান্টনার, ম্যাট হেনরি, লকি ফার্গুসন, ট্রেন্ট বোল্ট।