শ্রীলঙ্কার হামলা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ভাবনার বিষয়

শ্রীলঙ্কায় সহিংসতা নতুন নয়। সত্তরের দশকে বামপন্থী বিদ্রোহ বা পরবর্তী তিন দশক ধরে চলা তামিল টাইগারদের সাথে গৃহযুদ্ধের ধকল বইতে হয়েছে দেশটিকে। হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে এতে। তবে সর্বশেষ হামলা ইঙ্গিত দিচ্ছে, বোমা হামলার পেছনে যারা রয়েছে, তারা শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্রটি এর আগেও এরকম হামলা দেখেছে। আত্মঘাতী হামলাকারীদের ব্যবহার করেছে তামিল টাইগাররা। কিন্তু নতুন এই হামলার নির্মমতা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করেছে।

গৃহযুদ্ধ চলাকালীন বিদেশী পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনা ছিল বিরল। কিন্তু সর্বশেষ হামলায় অনেক বিদেশী নিহত হয়েছেন। ফলে আলকায়েদা অথবা আইএসের সাথে যোগাযোগের সন্দেহ আরো বাড়ছে। এরকম একটি অভিযানের জন্য বাইরে থেকে অনেক সহায়তা দরকার হয়। অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ এবং এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি দরকার হয়। সুতরাং এ ধরনের ঘটনা একা ঘটানো সম্ভব নয়। হয়তো তারা বাইরে থেকে সহায়তা পেয়েছে।

শ্রীলঙ্কায় আটটি আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৩৫৯ জন (পরে সরকার জানিয়েছে, আগের হিসাবে ভুল হয়েছিল, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ২৫৩) মানুষের মৃত্যু ও প্রায় ৫০০ মানুষের আহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে গত ২১ এপ্রিল রোববার।

কোনো গোষ্ঠী তাৎক্ষণিক এসব হামলার দায় স্বীকার না করলেও সরকারের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাজিথা সেনারতেœ বোমা হামলার জন্য স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ন্যাশনাল তওহিদ জামাতকে দায়ী করে বলেছিলেন, এর সাথে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক জড়িত রয়েছে, না হলে এই হামলা সম্ভব হতো না।

কিন্তু এর পরপরই ইসলামিক স্টেট- আইএস দাবি করেছে, তাদের সদস্যরা ওই হামলা করেছে। এরপরই ঘটনা মোড় নিতে থাকে অন্য দিকে।

শ্রীলঙ্কার সরকারি কর্তৃপক্ষ দৃশ্যত ধরে নিয়েছে, হামলাগুলো আইএস উগ্রবাদীরাই করেছে। ২৬ এপ্রিল খবর বেরিয়েছে, প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা বলেছেন, শ্রীলঙ্কার পুলিশ ১৪০ সন্দেহভাজন আইএস উগ্রবাদীকে গ্রেফতার করার জন্য অভিযান শুরু করেছে। আইএসের সংশ্লিষ্টতার জল্পনা থেকে এমন একটা কথা শোনা গিয়েছিল যে, গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে একজন সিরীয় নাগরিকও আছেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধারণা ভিত্তিহীন, গ্রেফতার ব্যক্তিরা সবাই শ্রীলঙ্কার নাগরিক।

প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে বলেছেন, হামলাকারীদের কেউ কেউ হামলার আগে বিদেশ সফর করে থাকতে পারে। শ্রীলঙ্কার সেনাপ্রধানের দাবি, হামলায় জড়িতদের মধ্যে কয়েকজন ভারতের কাশ্মির ও কেরালায় গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা নিয়ে ভারত শ্রীলঙ্কাকে আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছিল। সতর্ক করেছিল দেশটির মুসলমান সম্প্রদায়ও।

দেশটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর বিরোধ অনেক প্রশ্ন তৈরি করেছে। মন্ত্রিপরিষদ মুখপাত্র রাজিথা সেনারতেœ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নিরাপত্তাবিষয়ক আগাম তথ্য সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে। মূলত প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার সাথে তার গত বছরের বিরোধের জের ধরেই এটা ঘটেছে। সিরিসেনা রনিল বিক্রমাসিংহকে বরখাস্ত করে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছিলেন, যার জের ধরে তীব্র সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হয়েছিল। তিনি পরে বিক্রমাসিংহকে সুপ্রিম কোর্টের চাপের মুখে পুনর্বহাল করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু মনে হচ্ছে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্রিফিং থেকে তাকে অবহিত করা হয়নি।

শ্রীলঙ্কার পুলিশ ও নিরাপত্তা গোয়েন্দারা হামলাকারীদের ধরা ও তাদের আন্তর্জাতিক সংযোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এর মধ্যে এমন বক্তব্য শোনা গেছে, শ্রীলঙ্কার হামলাকারীদের সাথে দক্ষিণ ভারত, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর যোগাযোগ আছে। আরো একটা ভাষ্য হলো, মালদ্বীপে আইএসের কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ লিখেছেন, শ্রীলঙ্কার হামলাগুলো আইএসের ইতিহাসে সর্বাধিক বিধ্বংসী আত্মঘাতী হামলা। এমন হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য বড় ধরনের লজিস্টিক সমর্থন প্রয়োজন হয়। যথেষ্ট মিলিটারি-গ্রেড বিস্ফোরক পদার্থের প্রয়োজন হয়। এ রকম শক্তিশালী বোমা তৈরির জন্য ছোটখাটো কারখানার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার হামলাগুলোর পেছনে বেশ বড়, শক্তিশালী ও সুদক্ষ একটা সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক কাজ করেছে।

এফবিআই এবং ইন্টারপোলসহ আটটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ২১ এপ্রিলের বোমা হামলা নিয়ে শ্রীলঙ্কাকে তদন্তে সাহায্য করছে।

নতুন করে আবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে। গত মঙ্গলবার পার্লামেন্টে তিনি বলেছেন ‘আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। তবে আমাদের মনে রাখা উচিত, এ হুমকি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কারণ একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী দল এ কাজ করেছে।’

সিরিয়ায় চূড়ান্ত পতনের পর আইএসের এখন আর কোনো কেন্দ্রীয় ঘাঁটি নেই। কিন্তু সংগঠনটির কর্মীরা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দুনিয়ায়। তাই শ্রীলঙ্কার হামলা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য ভাবনার বিষয়।