সাহায্যের আবেদনের নামে ভয়ঙ্কর প্রতারণা

আট থেকে ১০ বছরের ফুটফুটে একটি শিশু। অ্যাশ কালারের কাজ করা পাঞ্জাবির সাথে মাথায় সুন্দর একটি টুপি। পরিপাটি এই শিশুটির পাসপোর্ট সাইজের ছবি লাগানো হয়েছে একটি সাহায্যের আবেদনে।

যে বিজ্ঞপ্তিতে লেখা হয়েছে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত আমার ছেলে জিলানীর সাহায্যের আবেদনটি আপনার পত্রিকায় প্রকাশের আবেদন। ২২ বছরের অপর এক যুবকের পাঞ্জাবি টুপি পরা আলাদা একটি ছবি দিয়ে আরো একটি বিজ্ঞপ্তিতে একই হেডিংয়ে বলা হয়েছে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত আমার ছেলে জিলানীর সাহায্যের আবেদনটি আপনার পত্রিকায় প্রকাশের আবেদন।

এই দুটি আবেদনের ছবি আলাদা হলেও বাকি প্রায় সবই এক। হেডিংয়ে জিলানী নাম উল্লেখ করা হলেও আবেদনের ভেতরে গিয়ে শুধু নাম ও বয়স পরিবর্তন করা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো দুই রোগীর প্রেসক্রিপশন, প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট হুবহু এক। কোনো এক রোগীর প্রেসক্রিপশন ও টেস্ট রিপোর্ট নিয়ে ফটোকপি করে দুটি আবেদনের সাথে বসিয়ে দেয়া হয়েছে।

প্রথম আবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমার ছেলে হাফেজ শিহাব (১২)। তালিমুল কুরআন মাদরাসার একজন মেধাবী ছাত্র। সে প্রায় তিন মাস কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত। ছেলের এই অবস্থায় আমার স্ত্রী বাকরুদ্ধ। স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম বসুরহাট, থানা ছাগলনাইয়া, জেলা ফেনী। বর্তমানে ৩১২/১ দক্ষিণ কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ-ঢাকাতে বসবাস করছি। আমি একটি কামিল মাদরাসায় সামান্য বেতনের শিক্ষক। বর্তমানে শিহাব আহছানিয়া মিশন ক্যান্সার হসপিটালের প্রফেসর ডা: এ কিউ এম মোহসিনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ডাক্তার কিছু পরীক্ষার কথা বলেন। সেই অনুযায়ী রিপোর্ট দেখালে তিনি বলেন শিহাবের উন্নত চিকিৎসা লাগবে। বিলম্ব হলে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতদিন নিজের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে চিকিৎসা চালিয়ে আসছিলাম। কিন্তু এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে আমার ছেলের চিকিৎসার জন্য আট লাখ টাকা প্রয়োজন। এদিকে আমি সহায় সম্বল হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। এই অবস্থায় সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, দাতা, প্রতিষ্ঠান, প্রবাসী ভাই-বোনেরা যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তাহলে আল্লাহর রহমতে আমার ছেলে নতুন জীবন ফিরে পাবে। সাহায্য পাঠানোর ঠিকানা : মো: আবিদুর রহমান, সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর ২০৫০১৩৬৬৭০০১৭৮৬১২, ফার্মগেট শাখা, ঢাকা। বিকাশ ০১৬৮৩৪৫৮৮৭৩।

বিজ্ঞপ্তিতে দেয়া ছবিটি দেখে যে কেউ ভাবতে পারেন এত সুন্দর শিশুটি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে। তাই কেউ কেউ হয়তো আর্থিক সহায়তা করতে পারেন। কিন্তু একই বাবা আবিদুর রহিম আরো একটি সাহায্যের আবেদন পাঠিয়েছেন। যে আবেদনের শুরু করা হয়েছে সেই ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত আমার ছেলে জিলানীর সাহায্যের আবেদনটি আপনার পত্রিকায় প্রকাশের আবেদন। যদিও প্রথম আবেদনে ওপরে জিলানীর নাম থাকলে ভেতরে লেখা হয়েছিল হাফেজ শিহাবের নাম। দ্বিতীয়টায় শিরোনামে জিলানীর নাম থাকলেও ভেতরে রয়েছে হাফেজ হাফিজুর রহমানের নাম। আগেরটায় শিহাবের বয়স ১২ বলা হলেও পরেরটায় হাফিজুরের বয়স দেয়া হয়েছে ২২। এ ছাড়া ভেতরের প্রায় সব লেখা, বাবার নাম, গ্রামের বাড়ির ঠিকানা, ঢাকার ঠিকানা সব কিছুই একই উল্লেখ করা হয়েছে। শিহাবের বাবার নাম আবিদুর রহমান। হাফিজুরের বাবার নামও আবিদুর রহমান। শিহাবের গ্রামের বাড়িও বসুরহাট, থানা ছাগলনাইয়া, জেলা ফেনী। হাফিজুরেরও একই। শিহাবের বর্তমান ঠিকানা ৩১২/১ দক্ষিণ কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, ঢাকা। হাফিজুরেরও ঠিক তাই।

এবারে আসা যাক তাদের দুইজনের আহছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসকদের দেয়া প্রেসক্রিপশনের বিবরণে। সাহায্যের আবেদনে দুজনের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা এক থাকলেও ভর্তি ফরমে তা সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে। ভর্তির ফরমে শিহাবের আগের ঠিকানা থাকলেও হাফিজুরের গ্রামের বাড়ি ফেনীর পরিবর্তে হয়ে গেছে বরিশালের ঝালকাঠির রাজাপুরে।

সব থেকে ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিয়েছে তাদের হুবহু একই প্রেসক্রিপশন। প্রফেসর ডা: এ কিউ এম মোহসিনের নাম ব্যবহার করে একই প্রেসক্রিপশন ফটোকপি করে দুজনের জন্যই দেয়া হয়েছে। তবে প্রেসক্রিপশন দুটির ওপরে নামের স্থানে হাতে লিখে দেয়া দুটি নাম। বাকি সবকিছুই অপরিবর্তিত রয়েছে। এমনকি প্যাথলজিক্যাল একই রিপোর্ট ফটোকপি করে দুজনের আবেদনের সাথে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।

এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, এটি একই ব্যক্তির রিপোর্ট। ওই সব রিপোর্টে আবার চিকিৎসক এ কিউ এম মোহসিনের সত্যায়ন করা সিল ও স্বাক্ষর রয়েছে। এদিকে সাহায্যের আবেদনে যে চিকিৎসকের স্বাক্ষর রয়েছে তাতেও কোনো মিল পাওয়া যায়নি। শিহাবের কাগজে ডা: মোহসিনের স্বাক্ষর শুরু হয়েছে ইংরেজি এম অক্ষর দিয়ে। আবার সেই একই মোহসিন নাম হাফিজুরেরটায় শুরু করা হয়েছে এল দিয়ে। তার মানে এই প্রেসক্রিপশন ও সাহায্য দেয়ার জন্য চিকিৎসকের অনুরোধপত্রেও রয়েছে বিরাট ঘাপলা।

বিষয়টি জানার জন্য দুটি আবেদনে থাকা মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রতিবারই মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।